ঈদের ছুটিতে পুলিশের মদদে গুলশানে বাড়ি দখলের অভিযোগ!
ঈদের ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে একটি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সামনেই এ ঘটনা ঘটলেও উল্টো ভুক্তভোগীদেরই হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার আলী আহম্মেদ মাসুদের উপস্থিতিতে এবং তার মদদে দখলের এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ বাড়ি মালিকের।
গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে গুলশান ১ নম্বর এলাকার ১২৭ নম্বর রোডের ১৫ নাম্বার বাড়িতে এ হামলা এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর সেখানে থাকা বাসিন্দাদের ও বাড়িটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সসদস্যদের বের করে দেওয়া হয়। শুক্রবার (২০ মার্চ) ফের আনসার সদস্যরা ওই বাড়িতে অবস্থান নিলেও দেখা যায়, দখলদাররা সেখানে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও সন্ত্রাসী হুমকির মতো মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গুলশান-১ এর ১২৭ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়িটি ১৯ কাঠা জায়গার ওপর অবস্থিত। ২০১৩ সালে আব্দুল আজিজ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে পুরাতন ভবনটি কেনেন মুন ইন্টারন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক তাবাছুম আরিফীন মুন। ভবনটিতে তার বোন বসবাস করে আসছিলেন।
জানা গেছে, প্রকৃত বিক্রেতা আব্দুল আজিজ মারা গেলেও মো. ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি আরেকজনকে ‘আব্দুল আজিজ’ সাজিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভবনটি দখলের চেষ্টা করে আসছেন।
বাড়িটির ম্যানেজার আবু সিকদার কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবারের আগেও এখানে হামলা হয়েছে। তিনি জানান, প্রথম ঘটনা ঘটে গত ১ মার্চ বিকেলে। তিনি বাড়ির মালিকের নির্দেশে বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ করাচ্ছিলেন। এ সময় ইসমাইল নামে এক ব্যক্তি ও তার সঙ্গে থাকা ২০-২৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি বাসায় জোর করে প্রবেশ করে কাজ বন্ধ করার জন্য হুমকি দেয়। না করলে তারা ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এরপর ওই ঘটনায় গুলশান থানায় মামলাও করা হয়।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং তা না দিলে বাড়ির সব কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। একই সঙ্গে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা চলে যায়। তবে যাওয়ার সময়ও তারা প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যায়।
একই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার পুলিশের ‘সহযোগিতায়’ ফের বাড়িটিতে হামলা চালিয়ে ও লুটপাট করে দখলে নেয় ইউসুফ ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনাতেও থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সময়ে বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন মুনের ফুফাতো বোন বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ইভা। থানায় দায়ের করা অভিযোগে তিনি বলেন, ওইদিন (বৃহস্পতিবার) সকালে বাসার দরজা বন্ধ করে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। দুপুরের দিকে ১০-১২ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে। হামলাকারীরা তার আলমারিতে থাকা প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার এবং দেড় লাখ টাকা নগদ নিয়ে যায়। এ সময় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।
ওই ঘটনার পর সম্পত্তিটির মালিক তাবাসসুম আরিফীন মুন এবং তার কর্মচারী মো. হাসান থানায় যান। থানায় যাওয়ার পর তাদেরই উল্টো নাজেহাল করা হয় বলে অভিযোগ করেন মুন।
তিনি কালবেলাকে বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে সন্ত্রাসীরা তার সম্পত্তিতে অবস্থান করছে। গুলশান জোনের এসির সহযোগীতায় গুলশানের মতো জায়গায় এমন ঘটনা ঘটল। তবে প্রশাসনের ঊধ্বর্তনদের সঙ্গে কথা বলে তিনি ফের আনসার মোতায়েন করেছেন। যদিও দখলদারদের কয়েকজনও বাড়িতে রয়েছে।
মো. হাসান বলেন, তাবাছুম আরিফীন মুন ২০১৩ সাল থেকে বাড়িটির মালিক এবং নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। কিন্তু মো. ইউসুফ নামের এক ব্যক্তি জাল কাগজপত্র তৈরি করে বাড়িটি দখলের চেষ্টা করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আমি এবং আমার স্যার থানায় অভিযোগ করতে গেলে উল্টো আমাদের হুমকি দেন এসি মাসুদ। আমাদের কাগজপত্র নাকি ভুয়া। এমনকি তিনি আমাদের হাজতে পাঠানোর ভয়ও দেখান। আমাদের বাসা ভাঙচুর করেছে, লুটপাট করেছে, আমি গিয়েছি থানায় অভিযোগ করতে, অথচ আমাকে বলে হাজতে ভরে দিবে। জমির কাগজ চেক করার পর বলে এগুলা ভুয়াও হতে পারে। আমার স্যারকে উনি বলেন যে আপনার লোকজন যারা আছে, তাদের ওই বাসায় যাওয়া যাবে না। ২৫ তারিখ থানায় আসবেন আইনজীবী নিয়ে। ওই পক্ষও আসবে, এরপর বসে সমাধান করা হবে। এর আগে কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করতে পারবে না। ওই বাসা পুলিশের জিম্মায় থাকবে।
হাসানের ভাষ্য, আমাদের লোকদের বের করে দিয়ে তিনি বলেছেন কেউ থাকতে পারবে না। কিন্তু ইসুফের লোকজন ওই বাড়িতে এখনো আছে। তারা বাড়িটি পুরোপুরি দখলের পাঁয়তারা করছে। তিনি কোন মামলাও নেন নাই এই ঘটনায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার আলী আহম্মেদ মাসুদ কালবেলাকে বলেন, ভাঙচুরের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম কী না সেটার ভিডিও ফুটেজ বের করেন। আমি ছিলাম কী ছিলাম না সেটা ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে। দুই পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা নিজের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। ঘটনার পর মামলা করতে চাইলেও তা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, মামলা তো নেবে থানার ওসি।
অবশ্য এই বিষয়ে গুলশান থানার ওসির বক্তব্য কালবেলা নিতে পারেনি।
কালবেলা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করুন

Comments
Post a Comment